অনিয়মিত মাসিক হওয়ার কারন ও চিকিৎসা

2
3797
অনিয়মিত মাসিক হওয়ার কারন

অনিয়মিত মাসিক এটা মেয়েদের সাধারণ একটি সমস্যা। মাসিক প্রক্রিয়ার এই অনিয়মকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় “ডিসমেনোরিয়া” বলা হয়। প্রতি মাসে এটা হয় বলে এটাকে বাংলায় সচরাচর মাসিক বলে চিহ্নিত করা হয়। মাসিক রজঃস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া নারীর গর্ভধারণের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্বাভাবিক ক্ষেত্রে এই মাসিক রজঃস্রাব আটাশ দিন পর পর হয়। তবে দুই একদিন আগে বা পরে হতে পারে। ঋতুস্রাব সমস্যা শুরু হলে প্রথমে গর্ভধারণ টেস্ট করা প্রয়োজন। অবশ্য শারীরিক ওজন বাড়লে বা কমলে অনিয়মিত ঋতুস্রাব হতে পারে।

অনিয়মিত ঋতুস্রাবের কারণ

১। শরীরে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের তারতম্যের কারণে এই সমস্যা হয়।
২। বিবাহিত নারীরা হঠাৎ জন্মনিয়ন্ত্রক পিল সেবন করা বন্ধ করে দিলে হতে পারে।
৩। বিভিন্ন ধরনের মানসিক চাপ ও চিন্তার কারনে অনিয়মিত মাসিক হতে পারে।
৪। শরীরের রক্ত কমে গেলে অর্থাৎ এনিমিয়া হলে অনিয়মিত মাসিক হতে পারে।
৫। অনেক সময় ওজন বেড়ে গেলে বা ওজন কমে গেলে মাসিকে সমস্যা দেখা দেয়।
৬। জরায়ুর বিভিন্ন জটিলতা বা রোগের কারণে অনিয়মিত মাসিক দেখা দিতে পারে।
৭। সহবাসের সময় পুরুষের শরীর থেকে বিস্তার করা রোগের কারণে হতে পারে। যেমনঃ গনোরিয়া, সিফিলিস সহ নানা রকম যৌন রোগ।
৮। শরীরের কোথাও টিউমার থাকলে ও ক্যান্সার হলে মাসিকে সমস্যা হতে পারে।
৯। যেসব নারীরা প্রথম বার শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ান সেসব নারীর অনিয়মিত মাসিক হতে পারে।
১০। যে সকল তরুণী মাসিকের আগে ও পরে প্রথম বা যৌন মিলন করেছেন তাদের অনিয়মিত মাসিকের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

অনিয়মিত মাসিকের সমস্যা

১) প্রতিমাসে নিয়মিত ঋতুস্রাব হয় না। এক মাসে রক্তপাত হলে পরবর্তী মাসে আর নিয়মিত হয় না। অনেকের ক্ষেত্রে দুই বা তিন মাস পরপর মাসিক হয়ে থাকে।
২) ঋতুস্রাব বেশি সময় ধরে হয়। কখনো অল্প রক্তপাত আবার কখনোও বেশি হয়।
৩) সন্তান ধারণ ক্ষমতা হ্রাস পায়। অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ হতে পারে।
৪) এ ছাড়া মেজাজ খিটখিটে থাকা এবং অস্বস্তিবোধ তৈরি হয়।

অনিয়মিত মাসিকের লক্ষণ

ডিসমেনোরিয়া ব্যথার একটি নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা অন্য রোগের ব্যথা থেকে আলাদা। এই ব্যথা মাসিক শুরু হবার কয়েক ঘণ্টা আগে শুরু হয় এবং ১২ থেকে ১৪ ঘন্টা পর্যন্ত ব্যথা স্থায়ী থাকে। আবার কখনও পুরো একদিনের বেশি সময় ধরে ব্যথা স্থায়ী হতে পারে। ব্যথা প্রথমে পেটের দিকে থাকে এবং পরে উরুর ভিতরের দিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ব্যথার তীব্রতায় চেহারা ফ্যাকাসে দেখায়, ঘাম নির্গত হয়। বমি বমি ভাব তীব্র ব্যথায় বমি অবশ্যই হতে পারে। পাতলা পায়খানাও হতে পারে। কখনও কখনও পায়খানা বা প্রস্রাব করতে কষ্ট হতে পারে।

অনিয়মিত মাসিকে প্রতিরোধ

১। স্বাস্থ্যহীনতা ভগ্নস্বাস্থ্য বা অপুষ্টির শিকার হয়ে থাকলে তা দূর করতে হবে। 
২। বিষণ্ণতায় মানসিক কষ্ট, কুসংস্কার কথা বা ভুল ধারণা দূর করতে হবে। 
৩। আক্রান্ত তরুণীদের বোঝাতে হবে যে মাসিক বা ঋতুস্রাব কোন রোগ নয় বরং প্রত্যেক নারীরই শরীরবৃত্তিয় একটি প্রক্রিয়া। 
৪। ঘরে বাইরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ থেকে দূরে থাকতে হবে এবং স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হবে।

অনিয়মিত ঋতুস্রাব হলে যা করনীয়

প্রচুর পরিমাণে পানি পান করুন এবং নিজেকে ঠান্ডা রাখুন। শারীরিক এবং মানসিক চাপ কমিয়ে ফেলুন। নিয়মিত শরীর চর্চা, সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন এবং ক্যাফেইন জাতীয় খাবার পরিহার করুন যেমন চা কফি বা চকলেট। ওজন বেশি থাকলে ওজন কমাতে হবে। নিয়মিত কাঁচা পেপে খেলে অনিয়মিত মাসিক দূর করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। তবে যারা গর্ভবতী তাদের কাঁচা পেপে না খাওয়াই ভাল, এতে গর্ভপাত সহ অতিরিক্ত রক্তপাত হতে পারে। জননাঙ্গের যক্ষা, গণোরিয়া, সিফিলিস, এইডস, ডায়াবেটিস প্রভৃতির কারণে হতে পারে। তাই যত দ্রুত সম্ভব এই সব রোগের সুচিকিৎসা করতে হবে। মাসিকের সময় প্রচুর পরিমাণে ক্যালশিয়াম ও আয়রনের চাহিদা হয় তাই ক্যালসিয়াম ও আয়রন যুক্ত সুষম খাবার খেতে হবে। পিরিয়ড বা মাসিক এক বা দুই সপ্তাহ আগে পরে হলে গাজর, কলা, আপেল, পেয়ারা, শসা খাবেন এবং এই সমস্যা দূর করার জন্যই অল্প অল্প করে দিতে চার থেকে পাঁচবার খাবার খাবেন। তাছাড়া যতটা সম্ভব সফটড্রিংক, কফি বা চা অতিরিক্ত পান করা থেকে বিরত থাকুন। টক জাতীয় খাবারে ভিটামিন সি থাকে তাই পরিমান মত টক বা ভিটামিন সি যুক্ত খাবার খাওয়ার চেষ্টা করতে হবে।

আঙুর ফলও পিরিয়ড রেগুলার করার জন্য খুবই কার্যকরী। প্রতিদিন আঙুরের জুস খেলে বা খাবারের তালিকায় আঙুর থাকলে প্রতি মাসে মাসিক নিয়মিত রাখতে সহায়তা করে। গাজরে রয়েছে প্রচুর বেটা ক্যরোটিন, যা মাসিক নিয়মিত করতে সাহায্য করে। এলোভেরা বা ঘৃতকুমারীর শাস রূপচর্চার পাশাপাশি মাসিক নিয়মিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যারা অযথা টেনশন বেশি করে তাদের ক্ষেত্রে অনিয়মিত মাসিকের সমস্যা বেশি হয়। তাই টেনশন বাদ দিয়ে নিজেকে পরিপূর্ণ ও প্রাণবন্ত রাখার চেষ্টা করতে হবে। কলা, তিল, তিসি বীজ, সবুজ শাকসবজি বেশি করে খাওয়া উচিত এতে আপনার শরীর ও মন প্রফুল্ল রাখবে এবং শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টির যোগান দিবে। প্রতিদিন ১০-১২ গ্লাস বিশুদ্ধ ঠান্ডা পানি পান করুন এতে শরীরে পানির চাহিদা পূরণ হবে। পিরিয়ডের সময় হরমনের অনুপাত ঠিক থাকে না। তাই পিরিয়ড পিছিয়ে যায়। যখনই পিরিয়ড পিছিয়ে যায় তখনই আপনি খেতে পারেন দুধ যা পিরিয়ডের অনুপাত ও হরমোন ঠিক রাখে। তবে অবশ্যয় তেল জাতীয় খাবার, ভাজা পোড়া, দুধের ছানা ও ডিমের কুসুম খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।

কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন?

১) যদি বছরে তিন বারের বেশি ঋতুস্রাব না হয়।
২) ঋতুস্রাব ২১ দিনের আগে এবং ৩৫ দিনের পরে হয়।
৩) ঋতুস্রাবের সময় বেশি রক্তপাত হলে।
৪) সাত দিনের বেশি সময় ধরে ঋতুস্রাব হলে।
৫) ঋতুস্রাবের সময় খুব ব্যথা হলে।

পরামর্শ

হোমিও চিকিৎসায় অনিয়মিত মাসিক সম্পূর্ণ ভাবে নির্মূল করা সম্ভব। তবে কোন মেডিসিন সেবন করার পূর্বে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সেবন করবেন।

2 COMMENTS

  1. আমার অনিয়মিত মাসিক হয়, তাই আপনার লেখা টা খুব মনযোগ দিয়ে পড়লাম। আমার জন্য দোয়া করবেন

    • সুইটি ইসলাম আখি, আপনার সুস্থ্যতা আমাদের একান্ত কাম্য

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here