বয়ঃসন্ধি কালের কিছু সমস্যা ও তার সমাধান

0
679

আমরা সচেতন কিন্তু আমাদের ছেলে-মেয়েদের বিশেষ কিছু সময়ে সচেতন নয়। কৈশোর ও বয়ঃসন্ধিকাল প্রায় একই সময় শুরু হলেও এক নয়। কৈশোর শুরু হয় ১১-১২ বছর বয়স থেকে। এ সময় দৈহিক বৃদ্ধির পাশপাশি মানসিক ও সামাজিক উন্নতি শুরু হয়।পরিবারের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে কার্যত মানসিক ও সামাজিকভাবে আত্মনির্ভরশীল বা স্বাধীন মানুষ হওয়ার সংগ্রামী জীবন পর্ব এটা। দৈহিক বৃদ্ধির পরিণতি বা সমাপ্তি ঘটে ২৩-২৫ বছরে।

বয়ঃসন্ধিকালের কিছু লক্ষণ

শৈশব থেকে কৈশোরে উত্তরণের পথে ব্যক্তির শারীরিক কিছু পরিবর্তন ঘটে। এ সময় মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস ও পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে গ্রোথ হরমোন নামে একটি রাসায়নিক যৌগ নিঃসরণ হয়। এই হরমোনের প্রভাবে অণ্ডকোষ ও ডিম্বাশয়ে পরিবর্তন হয় এবং এরা টেস্টোস্টেরন ও ইস্ট্রোজেন নামক হরমোন তৈরি করে। এদের প্রভাবে চুল, ত্বক, হাড়, বিভিন্ন অঙ্গ ও মাংসপেশিতে পরিবর্তন দেখা দেয়। একে বলে বয়ঃসন্ধি বা বয়ঃপ্রাপ্তি।এর মেয়াদ মাত্র এক থেকে তিন বছর। এ সময় ছেলে-মেয়েদের যৌনতার বিকাশ ঘটে। মেয়েদের পরিবর্তন শুরু হয় ছেলেদের চেয়ে এক বছর আগে। এ সময় ব্যক্তি-জীবনটা থাকে বড়ই আবেগপ্রবণ। কারণ শরীর খুব দ্রুত বদলাতে থাকে। তাল সামলানো কঠিন হয় বা প্রায়ই পারা যায় না।হরমোন বৃদ্ধির কারণে মেয়েদের শরীর থেকে মেয়েলী গন্ধ এবং ছেলেদের শরীর থেকে পুরুষালী গন্ধ প্রকটভাবে ছড়াতে থাকে। উভয়ের নরম চামড়া ভেদ করে, বিশেষ করে মুখে ফুসকুড়ি বা ব্রণ উঠতে থাকে।পুরো বয়ঃসন্ধি কালেই এ পরিবর্তন ঘটতে থাকে।

ছেলেদের ক্ষেত্রে

দেহের উচ্চতা বাড়ে থাকে মাংসপেশী দৃঢ় হতে থাকে।লিঙ্গ বড় ও মোটা হয়। অণ্ডকোষ ঝুলে যায় ও বড় হয়। মুখে গোঁফ-দাড়ি, বগলে, বুকে ও তলপেটে লোম এবং লিঙ্গের গোড়ায় যৌনকেশ গজায়। গলার স্বর অল্প সময়ের জন্য ভেঙে যায় ও ভারী হয়। মুখে তেল বাড়ে ও ব্রণ হয়।দেহে শুক্রকোষ তৈরি হয়।যৌন কামনা বাড়ে ও বীর্যপাত বা ‘স্বপ্নদোষ’ শুরু হয়। সন্তান জন্মদানে সক্ষম হয়।

মেয়েদের ক্ষেত্রে

দেহের উচ্চতা বাড়ে। কণ্ঠস্বর ভারী বা উঁচু হতে থাকে।মুখে তেল বাড়ে ও ব্রণ হয়। স্তন ও নিতম্ব আকারে বাড়ে ও ভারী হয়। বগলে লোম গজায়। মুখেও সামান্য লোম গজায়।যোনিপথের চারদিকে যৌনকেশ গজায়।দেহে ডিম্বকোষ তৈরি ও মাসিক ঋতুস্রাব শুরু হয়। যৌনসঙ্গমে ও গর্ভধারণে সক্ষম হয়। দশ থেকে চৌদ্দ বছর বয়সকালেই দৈহিকভাবে ছেলেরা সন্তান জন্মদান এবং মেয়েরা গর্ভধারণ করতে সক্ষম হলেও, পূর্ণাঙ্গ নর ও নারী কিংবা মা ও বাবা হওয়ার মতো সম্ভাবনা শক্তি তখনও সুপ্ত থাকে। দৈহিক পরিপুষ্টি, মানসিক প্রস্তুতি, আর্থিক ও সামাজিক পরিবেশ-পরিস্থিতি কোনটাই এ সময় ব্যক্তির অনুকূল থাকে না অথচ দেহে ও মনে একটা তাড়না প্রতিনিয়ত অনুভূত হয়।

কিছু প্রতিক্রিয়া

বেশীর্ভাগ ক্ষেত্রে কৈশোর শুরু হয় আগে। এ সময় মা-বাবা’র চোখে পড়ে যে, তাদের সন্তান ‘মুখে মুখে কথা বলে’, মা-কিংবা বাবাকে সহ্য করতে পারে না, সমালোচনা মুখর এবং অভিযোগ-মুখী হয়। বড়দের আদেশ/অনুরোধ/পরামর্শ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে অমান্য করতে চায় বা করেও। মা-বাবা ভাই-বানের চেয়ে সম-বয়সী বন্ধুদের প্রতি আকর্ষণ বেশী থাকে। সবকিছুর সীমা তলিয়ে দেখতে চায়; ভাল-মন্দ ও সম্ভব-অসম্ভব নিয়ে ভাবে না। ঘর ছেড়ে দূরে চলে যেতে চায়। বৈধভাবে সুযোগ না পেলে পালায়। এগুলো কৈশোর শুরু হওয়ার প্রাথমিক লক্ষণ। কিন্তু এর সঙ্গে যদি বয়ঃসন্ধি যুক্ত হয়, তবে আগুণে ঘি ঢালার মতো কৈশোরের রূপান্তরটা খুবই তীব্র আবেগাক্রান্ত এবং জটিল রূপ ধারণ করে।

বয়ঃসন্ধি একের ভেতর দুই সমস্যা সৃষ্টি করে। এক, দেহে যে পরিবর্তনগুলো শুরু হয়েছে, তা কিভাবে সামাল দিবে। এটি ব্যাক্তির আত্মসচেতনতাকে দগ্ধ করে। ব্যক্তিত্বকে বিচলিত ও অস্থির করে। দুই, আত্মপ্রকাশের সমস্যা- সে যে এখন বীর্যবান পুরুষ বা সোমত্ত নারী, এটা কিভাবে প্রকাশ করবে। এতকাল যারা তাকে ‘ছোট’ বা অপরিপক্ক মনে করে আসছে, তাদেরকে সে যে এখন ছোট আর নয়, এটা কিভাবে প্রমাণ করবে। আবার ‘পাকামো’ যেন না হয়, সে বদনাম কিভাবে ঘোচাবে। এ দ্বিধা-দ্বন্দ্বও তার ব্যক্তিত্বকে অস্থির করে তোলে। এটি মূলত তার একজন নারী বা পুরুষ-এর যথার্থ ভূমিকা পালন করার সমস্যা।

সমস্যা ও সমাধান

১। কিছু কিছু ছাত্র-ছাত্রীদের পরিবার অর্থাৎ বাবা ও মা একসঙ্গে থাকে না বা অশিক্ষিত। এই সব পরিবারের ছেলে-মেয়েদের বয়ঃসন্ধিকালে সমস্যাগুলো বেশি দেখা যায়। তারা বাসায় বাবা-মা কারো সান্নিধ্য ঠিকমতো পায় না। তাই তাদের সমস্যাগুলো নিয়ে কারো সাথে আলোচনাও করতে পারে না। ফলে নানান সমস্যার সৃষ্টি করে। এই সমস্ত শিক্ষার্থীদের স্কুলে বিশেষ রকমের সাহায্যের প্রয়োজন রয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরকেই তাদের বাবা-মার দায়িত্ব পালন করতে হবে।

২। কিছু কিছু বাবা-মা আছেন যারা তাদের ছেলে-মেয়েদের বয়ঃসন্ধিকালীন নানান সমস্যা নিয়ে স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। ফলে ছেলে-মেয়েদের সমস্যার সমাধান করতে সহজ হয়। আবার কিছু কিছু বাবা-মা এটা কিছুতেই মানতে চান না যে, তাদের ছেলে-মেয়ের কোন রকম সমস্যা রয়েছে। তারা উল্টো স্কুলকেই এসবের জন্য দায়ী করেন। এই ধরনের বাবা-মায়ের সমস্যাই আগে দূর করতে হবে। প্রয়োজনে তাদের সঙ্গে এসব নিয়ে আলোচান করার জন্য মিটিং এর ব্যবস্থা করতে হবে।

৩। কোন কোন ছেলে-মেয়ে বাসায় একরকম এবং স্কুলে অন্যরকম আচরণ করে। ফলে যখন স্কুল থেকে তাদের বাবা-মায়ের কাছে তাদের নামে রিপোর্ট যায় তখন তাদের বাবা-মা কিছুতেই বিশ্বাস করতে চান না যে এটা তাদের সন্তান করেছে। কারণ তাদের ছেলে-মেয়ে বাসায় কখনোই এমন আচরণ করেনা। এক্ষেত্রে আগে ছেলে-মেয়ের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে যে তার সমস্যা আসলে কোথায়? কেন সে এমন আচরণ করে?

৪। বর্তমানে দেখা যায় এমন অনেক বাবা-মা আছেন যে তারা তাদের নিজেদের কাজ নিয়ে এত ব্যস্ত থাকেন যে তাদের ছেলে-মেয়ে কি করছে বা তাদের কি কি সমস্যা হচ্ছে তা তারা দেখেনই না। দায়িত্ব পালন হিসেবে ছেলে-মেয়েরা যাতে স্বাধীনমতো চলতে পারে তাই তাদের টাকা দিয়ে দেন। এর ফলে সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে আরো বাড়তে থাকে।

৫। অনেক বাবা-মা আছেন যারা নিজেরা অতোটা শিক্ষিত না। যে কোনভাবে হোক অর্থ উপার্জন করেছেন। তারা এটাই ভাবেন যে ছেলে-মেয়ের জন্য স্কুলে এত মোটা অংকের টাকা দিচ্ছেন তাই সকল দায়িত্ব স্কুলের। তাদের কোন দায় দায়িত্ব নেই। বাবা-মাকে এটা বুঝতে হবে যে ছেলে-মেয়েদের প্রতি তাদের দায়-দায়িত্ব স্কুলের চাইতেও বেশি।

মা-বাবা এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের পক্ষে কৈশোর ও বয়ঃসন্ধি কালের সন্তান/শিক্ষার্থীকে সামলানো বা তার সমস্যার সমাধান করা অসম্ভব হলে, দেরী না করে অবশ্যই মনোবিজ্ঞানী বা মনোচিকিৎসক-এর পরামর্শ নেয়া উচিত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here